Dhaka ০৩:৩২ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৬ নভেম্বর ২০২৫, ১২ অগ্রহায়ণ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

বাংলাদেশের জলবায়ু সঙ্কট: তাপমাত্রা বৃদ্ধি, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা এবং কৃষি-জীবনের উপর গভীর প্রভাব

জহির শাহ ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি
  • Update Time : ১১:৫৬:১০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২২ নভেম্বর ২০২৫
  • / ১২ Time View

জহির শাহ্, বিশেষ প্রতিবেদন, ২২ নভেম্বর ২০২৫

ঢাকায় বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তনের ভবিষ্যৎ নিয়ে সাম্প্রতিক গবেষণা এক ভয়াবহ চিত্র উন্মোচন হয়েছে, যা দেশের কৃষি, জনস্বাস্থ্য, উপকূলীয় অঞ্চল এবং অর্থনীতির উপর অভূতপূর্ব চাপ সৃষ্টি করতে পারে। নরওয়েজিয়ান মেটিওরোলজিক্যাল ইনস্টিটিউট (এমইটি নরওয়ে) এবং বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর (বিএমডি) কর্তৃক যৌথভাবে প্রকাশিত ‘দ্য ফিউচার ক্লাইমেট অব বাংলাদেশ’ রিপোর্ট-২০২৫-এর ভিত্তিতে এই সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। রিপোর্টটি ২০১১ সাল থেকে চলমান যৌথ গবেষণার তৃতীয় সংস্করণ, যা সিএমআইপি৬-এনইএক্স-জিডিডিপি ডেটা এবং বিভিন্ন এমিশন সিনারিও (যেমন এসএসপি৩-৭.০ এবং এসএসপি৫-৮.৫) ভিত্তিতে ভবিষ্যৎ অনুমান করেছে।রিপোর্ট অনুসারে, ২০৪১ থেকে ২০৭০ সালের মধ্যে (মিড-সেনচুরি) দেশের গড় তাপমাত্রা ১ থেকে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেতে পারে, যা শতাব্দীর শেষ নাগাদ (২০৭১-২১০০) ১.৫ থেকে ৪.৫ ডিগ্রি পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে উচ্চ নির্গমন সিনারিওতে। দৈনিক সর্বোচ্চ তাপমাত্রা মিড-সেনচুরিতে ১ থেকে ২.৫ ডিগ্রি এবং শতাব্দীর শেষে ১.৫ থেকে ৪ ডিগ্রি বাড়তে পারে, বিশেষ করে পোস্ট-মনসুন এবং শীতকালে। সর্বনিম্ন তাপমাত্রা (রাতের) আরও দ্রুত বাড়বে: মিড-সেনচুরিতে ২ থেকে ৩ ডিগ্রি এবং শেষে ৩ থেকে ৪.৫ ডিগ্রি, যা রংপুর এবং রাজশাহীতে ৫ ডিগ্রির বেশি হতে পারে। এই রাত্রিকালীন উষ্ণতা দিন-রাতের তাপমাত্রার পার্থক্য কমাবে, যা মানুষের শরীরের বিশ্রাম প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করবে।গ্রীষ্মকালীন তাপপ্রবাহের (দৈনিক সর্বোচ্চ >৩৬ ডিগ্রি) ঘটনা এবং সময়কাল উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। প্রি-মনসুন মাসে (মার্চ-মে) তাপপ্রবাহের দিনগুলো বর্তমানের তুলনায় তিনগুণ হতে পারে শতাব্দীর শেষে, বিশেষ করে পশ্চিমাঞ্চলে যেখানে গুরুতর তাপপ্রবাহ (>৪০ ডিগ্রি) প্রতি মৌসুমে ১৫-২৫ দিন পর্যন্ত হতে পারে। এমনকি মনসুন, পোস্ট-মনসুন এবং শীতকালেও তাপপ্রবাহ ছড়িয়ে পড়তে পারে, যা বর্তমানের চেয়ে ৭৫ শতাংশ বেশি। ঢাকায় প্রতি বছর অন্তত দুটি তীব্র তাপপ্রবাহের সম্ভাবনা রয়েছে—বর্ষার আগে এবং পরে (অক্টোবর-নভেম্বর)। বিশ্বব্যাঙ্কের ক্লাইমেট পোর্টাল অনুসারে, এই তাপবৃদ্ধি মিড-সেনচুরিতে ১.৫-২.৫ ডিগ্রি এবং শেষে ৩-৪.৫ ডিগ্রি হতে পারে, যা কৃষিকাজ এবং শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা ২০-৩০ শতাংশ কমাতে পারে।শীতকালের প্রভাব কমে আসবে, এবং শতাব্দীর শেষে শীতকালীন কোল্ড স্পেলস (<১০ ডিগ্রি) প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে, যা বর্তমানের ৮ দিন থেকে কমে ০-৪ দিনে দাঁড়াবে উচ্চ নির্গমন সিনারিওতে। উপকূলীয় এলাকা থেকে শীত ধীরে ধীরে সরে যাবে। বর্ষার বৃষ্টিপাতও বাড়বে: ২০৭০ সাল নাগাদ গড়ে ১১৮ মিলিমিটার এবং ২১০০ সালে ২৫৫ মিলিমিটার বৃদ্ধি, যা মনসুন মৌসুমে ১৫ শতাংশ বেশি বৃষ্টি নির্দেশ করে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলে (সিলেট-সুনামগঞ্জ) এটি ৫৫০-৬০০ মিলিমিটার পর্যন্ত হতে পারে, যা বন্যা, ভূমিধস এবং নদীভাঙনের ঝুঁকি বাড়াবে। প্রি-মনসুন এবং পোস্ট-মনসুনেও বৃষ্টি ৭৫ মিলিমিটার এবং ২৯ মিলিমিটার বাড়তে পারে।সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি সবচেয়ে উদ্বেগজনক। বিশ্বব্যাপী গড়ে ২.১ মিলিমিটার/বছর হলেও বাংলাদেশের উপকূলে এটি ৩.৮-৫.৮ মিলিমিটার/বছর। শতাব্দীর শেষে গ্লোবাল মিন SLR ০.৬৩-১.০১ মিটার হতে পারে, যা বঙ্গোপসাগরে অনুরূপ (মিডিয়ান ০.৭৭ মিটার)। এতে উপকূলীয় অঞ্চলের ১২-১৮ শতাংশ স্থায়ীভাবে পানির নিচে চলে যেতে পারে, সুন্দরবনের ২৩ শতাংশ (৯১৮ বর্গকিলোমিটার) পানিবন্দি হবে। ২০৫০ সাল নাগাদ ৯ লাখ থেকে ১৮ লাখ মানুষ স্থায়ীভাবে বাস্তুচ্যুত হতে পারেন, এবং ২১০০ সালে ৫০ মিলিয়ন পর্যন্ত। স্যালিনিটি ইনট্রুশন গত চার দশকে ২৬ শতাংশ বেড়েছে, যা ১০৫.৬ মিলিয়ন হেক্টর জমিকে প্রভাবিত করেছে, ফসল এবং পানীয় জল দূষিত করে। সাইক্লোনের সাথে মিলে এটি বন্যা এবং স্টর্ম সার্জ বাড়াবে, যেমন ২০২০-এর আম্ফান সাইক্লোন ১৭৬,০০৭ হেক্টর কৃষিজমি নষ্ট করেছে।কৃষি খাতে বড় ধাক্কা লাগবে। তাপবৃদ্ধি এবং স্যালিনিটি ফসলের উৎপাদন হ্রাস করবে, যেমন ধান এবং গমের ফলন ১০-৩০ শতাংশ কমতে পারে উচ্চ তাপমাত্রায় ইভাপোট্রান্সপিরেশন এবং পেস্টসের কারণে। গবাদিপশুর রোগবালাই বাড়বে, দুধ-ডিম-মাংস উৎপাদন কমবে, এবং মিঠাপানির মাছের আবাস সংকুচিত হবে। স্যালিনিটি কোস্টাল এগ্রিকালচারকে ধ্বংস করবে, যা ৩০ শতাংশ কৃষিজমি হারাতে পারে ২০৫০ সালে। বিশ্বব্যাঙ্কের অনুমানে, জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশের জিডিপির ১-২ শতাংশ ক্ষতি করতে পারে বার্ষিক, যার মধ্যে কৃষি সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত। অ্যাডাপটেশন মেজারস যেমন লবণ-সহিষ্ণু ফসল, ঘের ফার্মিং এবং ফ্লোটিং এগ্রিকালচার জরুরি। জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়বে। তাপপ্রবাহ হিটস্ট্রোক, কার্ডিওভাসকুলার এবং রেসপিরেটরি রোগ বাড়াবে, বিশেষ করে বয়স্ক, শিশু এবং আউটডোর ওয়ার্কারদের মধ্যে। চরম তাপের দিন ১ শতাংশ বাড়লে শিশু স্টান্টিং ৫৬ শতাংশ বাড়তে পারে। ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া এবং কলেরার মতো ভেক্টর-বর্ন এবং ওয়াটারবর্ন রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়বে উষ্ণতা এবং আর্দ্রতার কারণে। স্যালিনিটি হাইপারটেনশন এবং অন্যান্য রোগ সৃষ্টি করবে, এবং বন্যা ৪৮০টির মতো হেল্থ ক্লিনিক এবং ৫০,০০০ টিউবওয়েল ধ্বংস করতে পারে যেমন ২০১৭-এর বন্যায় হয়েছে। বায়ু দূষণও বাড়বে স্ট্যাগন্যান্ট এয়ারের কারণে। অর্থনৈতিকভাবে, জলবায়ু বিপর্যয় বার্ষিক ৩ বিলিয়ন ডলার ক্ষতি করছে, এবং ২০১৯ সালে ৪.১ মিলিয়ন মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। প্রতি বছর ৭০০,০০০ মানুষ প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাস্তুচ্যুত হন, যা ঢাকার মতো শহরে স্লাম বৃদ্ধি ঘটায়—যেখানে ৫০ শতাংশ বস্তিবাসী গ্রামীণ অঞ্চল থেকে আসা ক্লাইমেট রিফিউজি। গবেষক এমডি বজলুর রশিদ বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তন হঠাৎ থেমে যাবে না। তাই প্রস্তুতি দীর্ঘমেয়াদি এবং বহুমাত্রিক হতে হবে। নির্গমন কমানো, উপকূলীয় সুরক্ষা অবকাঠামো জোরদার, বাঁধ ও আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, এবং আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ জরুরি।” নরওয়ের রাষ্ট্রদূত হ্যাকন অ্যারাল্ড গুলব্র্যান্ডসেন যোগ করেন, “জলবায়ু পরিবর্তন শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়। এটি কৃষি, স্বাস্থ্য, নগরায়ণ, জ্বালানি—সব খাতে প্রভাব ফেলছে। সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া ঝুঁকি মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।” রিপোর্টটি বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান ২১০০, মুজিব ক্লাইমেট প্রসপারিটি প্ল্যান এবং ন্যাশনাল অ্যাডাপটেশন প্ল্যান ২০২৩-২০৫০-এর মতো নীতির সাথে সংযোগ করে, যা লোকাল অ্যাডাপটেশনকে উত্সাহিত করে। বিশ্বব্যাপী ফসিল ফুয়েল ফেজ-আউট এবং গ্লোবাল ওয়ার্মিং সীমিত করা জরুরি, কারণ বাংলাদেশের নির্গমন মাত্র ০.৩ শতাংশ। এই গবেষণা আগামী দশকগুলোর জন্য একটি রোডম্যাপ প্রদান করতে পারে, কিন্তু তা বাস্তবায়ন না হলে সঙ্কট আরও গভীর হবে।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

বাংলাদেশের জলবায়ু সঙ্কট: তাপমাত্রা বৃদ্ধি, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা এবং কৃষি-জীবনের উপর গভীর প্রভাব

Update Time : ১১:৫৬:১০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২২ নভেম্বর ২০২৫

জহির শাহ্, বিশেষ প্রতিবেদন, ২২ নভেম্বর ২০২৫

ঢাকায় বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তনের ভবিষ্যৎ নিয়ে সাম্প্রতিক গবেষণা এক ভয়াবহ চিত্র উন্মোচন হয়েছে, যা দেশের কৃষি, জনস্বাস্থ্য, উপকূলীয় অঞ্চল এবং অর্থনীতির উপর অভূতপূর্ব চাপ সৃষ্টি করতে পারে। নরওয়েজিয়ান মেটিওরোলজিক্যাল ইনস্টিটিউট (এমইটি নরওয়ে) এবং বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর (বিএমডি) কর্তৃক যৌথভাবে প্রকাশিত ‘দ্য ফিউচার ক্লাইমেট অব বাংলাদেশ’ রিপোর্ট-২০২৫-এর ভিত্তিতে এই সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। রিপোর্টটি ২০১১ সাল থেকে চলমান যৌথ গবেষণার তৃতীয় সংস্করণ, যা সিএমআইপি৬-এনইএক্স-জিডিডিপি ডেটা এবং বিভিন্ন এমিশন সিনারিও (যেমন এসএসপি৩-৭.০ এবং এসএসপি৫-৮.৫) ভিত্তিতে ভবিষ্যৎ অনুমান করেছে।রিপোর্ট অনুসারে, ২০৪১ থেকে ২০৭০ সালের মধ্যে (মিড-সেনচুরি) দেশের গড় তাপমাত্রা ১ থেকে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেতে পারে, যা শতাব্দীর শেষ নাগাদ (২০৭১-২১০০) ১.৫ থেকে ৪.৫ ডিগ্রি পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে উচ্চ নির্গমন সিনারিওতে। দৈনিক সর্বোচ্চ তাপমাত্রা মিড-সেনচুরিতে ১ থেকে ২.৫ ডিগ্রি এবং শতাব্দীর শেষে ১.৫ থেকে ৪ ডিগ্রি বাড়তে পারে, বিশেষ করে পোস্ট-মনসুন এবং শীতকালে। সর্বনিম্ন তাপমাত্রা (রাতের) আরও দ্রুত বাড়বে: মিড-সেনচুরিতে ২ থেকে ৩ ডিগ্রি এবং শেষে ৩ থেকে ৪.৫ ডিগ্রি, যা রংপুর এবং রাজশাহীতে ৫ ডিগ্রির বেশি হতে পারে। এই রাত্রিকালীন উষ্ণতা দিন-রাতের তাপমাত্রার পার্থক্য কমাবে, যা মানুষের শরীরের বিশ্রাম প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করবে।গ্রীষ্মকালীন তাপপ্রবাহের (দৈনিক সর্বোচ্চ >৩৬ ডিগ্রি) ঘটনা এবং সময়কাল উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। প্রি-মনসুন মাসে (মার্চ-মে) তাপপ্রবাহের দিনগুলো বর্তমানের তুলনায় তিনগুণ হতে পারে শতাব্দীর শেষে, বিশেষ করে পশ্চিমাঞ্চলে যেখানে গুরুতর তাপপ্রবাহ (>৪০ ডিগ্রি) প্রতি মৌসুমে ১৫-২৫ দিন পর্যন্ত হতে পারে। এমনকি মনসুন, পোস্ট-মনসুন এবং শীতকালেও তাপপ্রবাহ ছড়িয়ে পড়তে পারে, যা বর্তমানের চেয়ে ৭৫ শতাংশ বেশি। ঢাকায় প্রতি বছর অন্তত দুটি তীব্র তাপপ্রবাহের সম্ভাবনা রয়েছে—বর্ষার আগে এবং পরে (অক্টোবর-নভেম্বর)। বিশ্বব্যাঙ্কের ক্লাইমেট পোর্টাল অনুসারে, এই তাপবৃদ্ধি মিড-সেনচুরিতে ১.৫-২.৫ ডিগ্রি এবং শেষে ৩-৪.৫ ডিগ্রি হতে পারে, যা কৃষিকাজ এবং শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা ২০-৩০ শতাংশ কমাতে পারে।শীতকালের প্রভাব কমে আসবে, এবং শতাব্দীর শেষে শীতকালীন কোল্ড স্পেলস (<১০ ডিগ্রি) প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে, যা বর্তমানের ৮ দিন থেকে কমে ০-৪ দিনে দাঁড়াবে উচ্চ নির্গমন সিনারিওতে। উপকূলীয় এলাকা থেকে শীত ধীরে ধীরে সরে যাবে। বর্ষার বৃষ্টিপাতও বাড়বে: ২০৭০ সাল নাগাদ গড়ে ১১৮ মিলিমিটার এবং ২১০০ সালে ২৫৫ মিলিমিটার বৃদ্ধি, যা মনসুন মৌসুমে ১৫ শতাংশ বেশি বৃষ্টি নির্দেশ করে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলে (সিলেট-সুনামগঞ্জ) এটি ৫৫০-৬০০ মিলিমিটার পর্যন্ত হতে পারে, যা বন্যা, ভূমিধস এবং নদীভাঙনের ঝুঁকি বাড়াবে। প্রি-মনসুন এবং পোস্ট-মনসুনেও বৃষ্টি ৭৫ মিলিমিটার এবং ২৯ মিলিমিটার বাড়তে পারে।সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি সবচেয়ে উদ্বেগজনক। বিশ্বব্যাপী গড়ে ২.১ মিলিমিটার/বছর হলেও বাংলাদেশের উপকূলে এটি ৩.৮-৫.৮ মিলিমিটার/বছর। শতাব্দীর শেষে গ্লোবাল মিন SLR ০.৬৩-১.০১ মিটার হতে পারে, যা বঙ্গোপসাগরে অনুরূপ (মিডিয়ান ০.৭৭ মিটার)। এতে উপকূলীয় অঞ্চলের ১২-১৮ শতাংশ স্থায়ীভাবে পানির নিচে চলে যেতে পারে, সুন্দরবনের ২৩ শতাংশ (৯১৮ বর্গকিলোমিটার) পানিবন্দি হবে। ২০৫০ সাল নাগাদ ৯ লাখ থেকে ১৮ লাখ মানুষ স্থায়ীভাবে বাস্তুচ্যুত হতে পারেন, এবং ২১০০ সালে ৫০ মিলিয়ন পর্যন্ত। স্যালিনিটি ইনট্রুশন গত চার দশকে ২৬ শতাংশ বেড়েছে, যা ১০৫.৬ মিলিয়ন হেক্টর জমিকে প্রভাবিত করেছে, ফসল এবং পানীয় জল দূষিত করে। সাইক্লোনের সাথে মিলে এটি বন্যা এবং স্টর্ম সার্জ বাড়াবে, যেমন ২০২০-এর আম্ফান সাইক্লোন ১৭৬,০০৭ হেক্টর কৃষিজমি নষ্ট করেছে।কৃষি খাতে বড় ধাক্কা লাগবে। তাপবৃদ্ধি এবং স্যালিনিটি ফসলের উৎপাদন হ্রাস করবে, যেমন ধান এবং গমের ফলন ১০-৩০ শতাংশ কমতে পারে উচ্চ তাপমাত্রায় ইভাপোট্রান্সপিরেশন এবং পেস্টসের কারণে। গবাদিপশুর রোগবালাই বাড়বে, দুধ-ডিম-মাংস উৎপাদন কমবে, এবং মিঠাপানির মাছের আবাস সংকুচিত হবে। স্যালিনিটি কোস্টাল এগ্রিকালচারকে ধ্বংস করবে, যা ৩০ শতাংশ কৃষিজমি হারাতে পারে ২০৫০ সালে। বিশ্বব্যাঙ্কের অনুমানে, জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশের জিডিপির ১-২ শতাংশ ক্ষতি করতে পারে বার্ষিক, যার মধ্যে কৃষি সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত। অ্যাডাপটেশন মেজারস যেমন লবণ-সহিষ্ণু ফসল, ঘের ফার্মিং এবং ফ্লোটিং এগ্রিকালচার জরুরি। জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়বে। তাপপ্রবাহ হিটস্ট্রোক, কার্ডিওভাসকুলার এবং রেসপিরেটরি রোগ বাড়াবে, বিশেষ করে বয়স্ক, শিশু এবং আউটডোর ওয়ার্কারদের মধ্যে। চরম তাপের দিন ১ শতাংশ বাড়লে শিশু স্টান্টিং ৫৬ শতাংশ বাড়তে পারে। ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া এবং কলেরার মতো ভেক্টর-বর্ন এবং ওয়াটারবর্ন রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়বে উষ্ণতা এবং আর্দ্রতার কারণে। স্যালিনিটি হাইপারটেনশন এবং অন্যান্য রোগ সৃষ্টি করবে, এবং বন্যা ৪৮০টির মতো হেল্থ ক্লিনিক এবং ৫০,০০০ টিউবওয়েল ধ্বংস করতে পারে যেমন ২০১৭-এর বন্যায় হয়েছে। বায়ু দূষণও বাড়বে স্ট্যাগন্যান্ট এয়ারের কারণে। অর্থনৈতিকভাবে, জলবায়ু বিপর্যয় বার্ষিক ৩ বিলিয়ন ডলার ক্ষতি করছে, এবং ২০১৯ সালে ৪.১ মিলিয়ন মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। প্রতি বছর ৭০০,০০০ মানুষ প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাস্তুচ্যুত হন, যা ঢাকার মতো শহরে স্লাম বৃদ্ধি ঘটায়—যেখানে ৫০ শতাংশ বস্তিবাসী গ্রামীণ অঞ্চল থেকে আসা ক্লাইমেট রিফিউজি। গবেষক এমডি বজলুর রশিদ বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তন হঠাৎ থেমে যাবে না। তাই প্রস্তুতি দীর্ঘমেয়াদি এবং বহুমাত্রিক হতে হবে। নির্গমন কমানো, উপকূলীয় সুরক্ষা অবকাঠামো জোরদার, বাঁধ ও আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, এবং আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ জরুরি।” নরওয়ের রাষ্ট্রদূত হ্যাকন অ্যারাল্ড গুলব্র্যান্ডসেন যোগ করেন, “জলবায়ু পরিবর্তন শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়। এটি কৃষি, স্বাস্থ্য, নগরায়ণ, জ্বালানি—সব খাতে প্রভাব ফেলছে। সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া ঝুঁকি মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।” রিপোর্টটি বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান ২১০০, মুজিব ক্লাইমেট প্রসপারিটি প্ল্যান এবং ন্যাশনাল অ্যাডাপটেশন প্ল্যান ২০২৩-২০৫০-এর মতো নীতির সাথে সংযোগ করে, যা লোকাল অ্যাডাপটেশনকে উত্সাহিত করে। বিশ্বব্যাপী ফসিল ফুয়েল ফেজ-আউট এবং গ্লোবাল ওয়ার্মিং সীমিত করা জরুরি, কারণ বাংলাদেশের নির্গমন মাত্র ০.৩ শতাংশ। এই গবেষণা আগামী দশকগুলোর জন্য একটি রোডম্যাপ প্রদান করতে পারে, কিন্তু তা বাস্তবায়ন না হলে সঙ্কট আরও গভীর হবে।